• পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
  • মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১১ কার্তিক ১৪২৮
  • ||
  • আর্কাইভ

প্রাণ-এর কারখানায় চলছে আমের পাল্পিং

প্রকাশ:  ০৯ জুন ২০২১, ১২:৫১
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট

‘আগে গুটিজাতের আম কেউ নিত না, বেশি টক বলে বাজারেও বিক্রি করা যেত না; কাঁচা থাকতে অল্প কিছু আচারের জন্য বিক্রি হতো। বাকিটা পচেই শেষ। কিন্তু কয়েক বছর হলো ওইদিন আর নেই। গুটি আমেও ভালো দাম পাচ্ছি। কোম্পানিগুলো কিনছে।’

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার একটি বাগানে এসব কথা বলছিলেন আমচাষি বুলবুল আহম্মেদ। সেখানে প্রায় ৬০০ গাছের একটি বাগান তিন বছরের জন্য লিজ নিয়ে চাষ করছেন তিনি। বাগান থেকে গুটি আম সংগ্রহ করছিলেন পার্শ্ববর্তী প্রাণ-এর বরেন্দ্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে দেবেন বলে।

বুলবুল জানান, তার এ বাগানটি একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের নিজস্ব জমি। বাগানে অন্যান্য ভালো জাতের আম গাছের পাশাপাশি প্রচুর গুটি আমের গাছও রয়েছে। কিন্তু আগে গুটি আম বিক্রি হতো না বলে এ বাগান খুব একটা লাভজনক ছিল না।

বুলবুলের ভাষ্য, ‘প্রাণ-এর কারখানা হওয়ার পর থেকে গুটি আমও ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। এ জন্য গত বছরও ভালো মুনাফা করেছি, এ বছরও করব। কোম্পানির কারখানা আমাদের জন্য আশীর্বাদ।’

দেশের মোট উৎপাদিত আমের প্রায় অর্ধেকের বেশি আসে নাটোর, নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে। এসব এলাকায় যেমন নানা উন্নত জাতের আমের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে, তেমনি আগে থেকে প্রচুর গুটি আম গাছ রয়েছে, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ১৫-২০ শতাংশ। কিন্তু প্রতি বছর এ বড় অংশের আম নষ্ট হচ্ছে। আমের যে সার্বিক অপচয়; এর মধ্যে গুটি আমের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।

রাজশাহীর ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলীম উদ্দিন বলেন, ‘গুটিসহ যেসব টক আমের চাহিদা বাজারে নেই; সেগুলো প্রক্রিয়াকরণ খুবই কার্যকরী। ইতোমধ্যে বড় কিছু কোম্পানি তা শুরু করছে। আগে যে আম নষ্ট হতো, সেটি প্রক্রিয়াকরণ করে আর্থিক খাতে যোগ করছে। এটি ভালো উদ্যোগ, এতে আমের অপচয় অনেক কমেছে।’

রাজশাহী অঞ্চলে গোদাগাড়ীতে বিশাল পাল্প সংগ্রহ কারখানা করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাণ। যেখানে বর্তমানে প্রতিদিন ৪০০ টন আমের পাল্প করার সক্ষমতা রয়েছে। চলতি বছর এ অঞ্চলে প্রাণ প্রায় ৩০ হাজার টন পাকা আম কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংগৃহীত আম থেকে পাল্প উৎপাদন করে অ্যাসেপটিক (পচনরোধী) পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয়। এ পাল্প সংরক্ষিত স্থান থেকে ড্রামে করে চাহিদার ভিত্তিতে নরসিংদীর প্রাণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, গাজীপুরের আরএফএল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ও হবিগঞ্জে অবস্থিত হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে নিয়ে যাওয়া হয় ফ্রুট ড্রিংক ও জুস তৈরির জন্য।

প্রাণ এগ্রো বিজনেস লিমিটেডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার এস এম সারোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৭ সালে আম, পেয়ারা ও টমেটো প্রক্রিয়াকরণের জন্য এ কারখানাটি চালু করে প্রাণ। এ এলাকায় এসব পণ্য প্রচুর পাওয়া যায়। শুরুর পর থেকেই প্রাণ-এর নাটোরের কারখানার পাশাপাশি এখানে আম প্রসেসিং হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় প্রাণ-এর প্রায় ১২ হাজার চুত্তিভিত্তিক চাষি রয়েছেন। যাদের কাছ থেকে প্রতিদিন আম সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রাণ-এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে আমচাষ করে উত্তরাঞ্চলের অনেক কৃষক সৌভাগ্যের মুখ দেখছেন। প্রাণ আমচাষিদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে আম সংগ্রহ করে। ফলে আমচাষিদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় তারা আরও চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন এবং দিন দিন লাভবান হচ্ছেন।

jagonews24

বরেন্দ্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে সরেজমিন

সকাল থেকেই চাষিরা আম নিয়ে আসতে থাকেন বরেন্দ্রের এ কারখানায়। আম প্রবেশের সময় কোয়ালিটি কন্ট্রোলার দ্বারা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তা গ্রহণ করা হয়। প্রথমে আমগুলো পাকা কি-না তা দেখা হচ্ছে, পোকা-রোগমুক্ত এবং পচা কি-না তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এরপর ল্যাবে পাঠানো হয় ফরমালিন, ব্রিক্স, পি-এইচসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য। ল্যাব টেস্টে উত্তীর্ণ হলেই কেবল তার আম ফ্যাক্টরিতে প্রসেসের জন্য নেয়া হয়।

এরপর স্বয়ংক্রিয় মেশিনের সহায়তায় ফলগুলো পাঠানো হয় ওয়াশিংয়ে। সেখানে গরম ও ঠান্ডা পানিতে কয়েক দফা ধোয়ার পর বেল্টের মাধ্যমে তা চলে যায় ক্র্যাশিং প্লান্টে। ক্র্যাশিং প্লান্টের বড় যন্ত্রগুলো লিকুউড তৈরির কাজটি করে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমের খোসা ও বিচি (আঁটি) আলাদা হয়ে বেরিয়ে আসে। কারখানায় খোসা ও বিচিও ফেলে দেয়া হয় না। এগুলো আলাদা করে তৈরি হয় গবাদিপশুর খাদ্য এবং জ্বালানি।

jagonews24

কারখানায় কোয়ালিটি কন্ট্রোল ম্যানেজার আব্দুল হালিম বলেন, পাল্প তৈরির পর সেগুলো অ্যাসেপটিক পদ্ধতিতে দুই বছর পর্যন্ত রাখা যায়। এর মধ্যে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পাল্প থেকে তৈরি হয় ম্যাংগো ফ্রুট ড্রিংক ও জুস।

তিনি বলেন, আমাদের এ পদ্ধতি একেবারেই স্বয়ংক্রিয় ও নিরাপদ। রিফাইনারি মেশিনে পাল্প পরিশোধন ও স্টেরালাইজড করে পাল্পকে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করা হয়। এরপর কোনো হাতের স্পর্শ ছাড়াই অ্যাসেপটিক প্রযুক্তিতে পাল্প সংরক্ষণ করা হয়। এ পদ্ধতির সুবিধে হলো সবসময় পাল্পটি তাজা ও স্বাদ অক্ষুণ্ন থাকে।

jagonews24

নেই গ্যাস সংযোগ

এখানে পাল্প তৈরি করলেও তা থেকে ম্যাংগো ফ্রুট ড্রিংক বা জুস তৈরি করা হয় না। এ জন্য এ পাল্প নিতে হয় অন্য কারখানায়। যাতে বাড়ে খরচ। কারণ এ এলাকায় গ্যাসের সংযোগ নেই।

এস এম সারোয়ার হোসেন বলেন, গ্যাস না থাকায় এখানে ফিনিস প্রডাক্ট হচ্ছে না। সেটি হলে খরচ কমত। ভোক্তারা আরও কম দামে পেতেন। পাশাপাশি শুধু ড্রিংক ও জুস তৈরি নয়, সরাসরি রফতানি করা যাবে।

তিনি বলেন, প্রাণ গ্রুপের লক্ষ্য আগামী দিনে ম্যাংগো ফ্রুট ড্রিংকের পাশাপাশি সরাসরি ম্যাংগো পাল্প বিদেশে রফতানি করা। কিন্তু দেশের অনেক কোম্পানি উত্তরাঞ্চলে আম সংগ্রহ ও পাল্প প্রক্রিয়াকরণ কারখানা করলেও গ্যাস সংকটের কারণে ঢাকার আশেপাশের জেলায় অবস্থিত কারখানাগুলোতে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে ড্রিংক ও জুস তৈরি করছে। উত্তরাঞ্চলের কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে এ খাত আরও সমৃদ্ধ হবে।

jagonews24

উল্লেখ্য, প্রতি বছরের মতো এবারও আম সংগ্রহ এবং পাল্পিং কার্যক্রম শুরু করেছে দেশের সর্ববৃহৎ কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণ। ম্যাংগো ড্রিংক, জুস, ম্যাংগো বারসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী তৈরি করতে পাকা আম সংগ্রহ করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে ৬০ হাজার মেট্রিক টন আম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

গত ১ জুন বিকেলে গোদাগাড়ী বরেন্দ্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে (বিআইপি) আম সংগ্রহ ও পাল্পিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন কারখানার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সারোয়ার হোসেন। একই সময় নাটোর একডালার প্রাণ এগ্রো কারখানায়ও আম সংগ্রহ ও পাল্পিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।