• পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
  • বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩
  • ||
  • আর্কাইভ

তথ্য গোপনের অভিযোগে চাঁদপুরে কেন্দ্র সচিবকে অব্যাহতি

প্রকাশ:  ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৪
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট

চাঁদপুরে চলমান এসএসসি পরীক্ষাকে ঘিরে কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব পালনকালে তথ্য গোপনের অভিযোগে এক শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি চাঁদপুর সদর উপজেলার ফরাক্কাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব মো. ইলিয়াছ মিয়া। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএমএন জামিউল হিকমা তাকে কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন। এ ঘটনায় শিক্ষা প্রশাসন ও স্থানীয় মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, গত সোমবার (২০ এপ্রিল) ফরাক্কাবাদ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসাইন চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা যদি পরীক্ষার্থীর অভিভাবক হন—বিশেষ করে তার সন্তান একই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে—তাহলে তিনি কোনোভাবেই কেন্দ্র সচিব বা পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এটি স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য বাধ্যতামূলক বিধান।
অভিযোগে আরও বলা হয়, মো. ইলিয়াছ মিয়ার মেয়ে রাইসা অরিন আনিকা চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে। তিনি চাঁদপুর শহরের আল-আমিন একাডেমির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। অথচ এ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রেখে ইলিয়াছ মিয়া কেন্দ্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন, যা শিক্ষা বোর্ডের নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।
এ বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, পরীক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন তথ্য গোপন করা শুধু অনৈতিকই নয়, বরং তা পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট করে। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতে প্রশ্নফাঁস, পক্ষপাতিত্ব বা অন্যান্য গুরুতর অনিয়মের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয় উপজেলা প্রশাসন। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএমএন জামিউল হিকমা কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব থেকে ইলিয়াছ মিয়াকে অব্যাহতি দেওয়ার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে চাঁদপুর সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, আমরা অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেছি। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাওয়ায় তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এখন বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে, অভিযুক্ত কেন্দ্র সচিব মো. ইলিয়াছ মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে তার মেয়ে পরীক্ষার্থী হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে পরে তিনি নিজের বক্তব্য থেকে সরে এসে বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তার এই দ্বৈত অবস্থান আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। পরীক্ষা কেন্দ্রের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, প্রশ্নপত্র গ্রহণ ও বিতরণ, পরীক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা—সবকিছুই তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। তাই এ পদে থাকা ব্যক্তির সততা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নাতীত হওয়া জরুরি। কোনো ধরনের স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকলে তা আগে থেকেই প্রকাশ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব থেকে বিরত থাকা উচিত।
এ ঘটনায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেক অভিভাবক বলেন, তারা চান তাদের সন্তানরা একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পরিবেশে পরীক্ষা দিক। এ ধরনের ঘটনা সেই আস্থাকে নষ্ট করে। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। সকলে মনে করছেন, শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কেন্দ্র সচিব ও পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি নীতিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
চাঁদপুরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনা দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে নিয়ম-কানুন কঠোরভাবে অনুসরণ করা ছাড়া বিকল্প নেই—এমনটাই মত সচেতন মহলের।