এক ম্যাচেই মেসির চার গিনেস রেকর্ড

লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ যেন এখন শুধুই রেকর্ড বাড়ানোর মঞ্চ। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনাকে শেষ ৩২-এ তোলার দিনে শুধু বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাই হননি তিনি, গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের হিসাবেও চারটি বড় বিশ্বকাপ রেকর্ডে নিজের নাম আরও উঁচুতে তুলেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
ডালাসে গ্রুপ ‘জে’-এর ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের দুই গোলই মেসির। ৩৮ মিনিটে প্রথম গোল করে তিনি মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে যান। যোগ করা সময়ে আরেক গোল করে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে যান ১৮-তে। এই জয়ে দুই ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। অস্ট্রিয়া ম্যাচের পর গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের আলোচনায় মেসির চারটি বড় রেকর্ড উঠে এসেছে। গোল, জয়, ম্যাচ ও মিনিট—বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সূচকেই এখন তাঁর নাম সবার ওপরে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোলের আগে মেসি ছিলেন ক্লোসের পাশে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে পুরুষদের বিশ্বকাপে ১৬ গোলে পৌঁছেছিলেন তিনি। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোল তাকে ক্লোসের ওপরে তোলে, দ্বিতীয় গোল রেকর্ডটা আরও বাড়িয়ে দেয়।
মেসির বিশ্বকাপ গোল এখন ১৮। এতে তিনি শুধু পুরুষদের বিশ্বকাপে ক্লোসেকে ছাড়াননি, নারী-পুরুষ মিলিয়েও সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। ব্রাজিলের নারী ফুটবল কিংবদন্তি মার্তা বিশ্বকাপে করেছিলেন ১৭ গোল। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় গোলের পর মেসি সেই সংখ্যাটিও ছাড়িয়ে যান। তবে এই রেকর্ড পুরোপুরি নিরাপদ নয়। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপে ১৬ গোলে পৌঁছেছেন। বয়স মাত্র ২৭। তাই মেসি এখন শীর্ষে থাকলেও এমবাপে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জার হয়ে উঠেছেন।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জয় মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ১৮তম জয়। এই রেকর্ডেও তিনি ছাড়িয়ে গেছেন ক্লোসেকে। জার্মান কিংবদন্তির বিশ্বকাপ জয় ছিল ১৭টি। ২০০২, ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপ মিলিয়ে সেই রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। মেসির প্রথম বিশ্বকাপ জয় ২০০৬ সালে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬—ছয় বিশ্বকাপজুড়ে জয় যোগ হতে থাকে। কাতার ২০২২-এ মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া ও ফ্রান্সের বিপক্ষে জয়ের পথ ধরে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন তিনি। ২০২৬ সালে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জয়ে সেই সংখ্যা এখন ১৮।
এই রেকর্ড মেসির দীর্ঘস্থায়িত্বের বড় প্রমাণ। শুধু অনেক বিশ্বকাপ খেলেছেন, তা নয়; প্রায় প্রতিটি আসরেই দলকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে গেছেন। ২০১৪ সালে ফাইনাল, ২০২২ সালে শিরোপা, ২০২৬ সালে আবার নকআউট—একই খেলোয়াড়ের এমন ধারাবাহিকতা বিশ্বকাপ ইতিহাসে বিরল।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড মেসি আগেই নিজের করেছিলেন। কাতার ২০২২ ফাইনালে জার্মানির লোথার ম্যাথিউসকে ছাড়িয়ে ২৬ ম্যাচে পৌঁছেছিলেন তিনি। ২০২৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে খেলে সেই সংখ্যা এখন ২৮। মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু ২০০৬ সালে। তখন তিনি ছিলেন তরুণ প্রতিভা। ২০১০ সালে খেলা গড়ার কারিগর, ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলা অধিনায়ক, ২০১৮ সালে হতাশার আসর, ২০২২ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং ২০২৬ সালে রেকর্ডের পর রেকর্ড বাড়ানো অভিজ্ঞ মহাতারকা—মেসির ২৮ ম্যাচের ভেতরেই এক পূর্ণ ফুটবল-জীবনের গল্প আছে।
এই রেকর্ড শুধু উপস্থিতির নয়, প্রাসঙ্গিক থাকারও। অনেক ফুটবলার দীর্ঘ ক্যারিয়ার পান, কিন্তু এত বছর ধরে বিশ্বকাপের কেন্দ্রে থাকা অন্য ব্যাপার। মেসি সেই জায়গাটাই আলাদা করেছেন। ম্যাচ সংখ্যার মতো মিনিটের রেকর্ডেও মেসি সবার ওপরে। ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে তিনি ইতালির কিংবদন্তি ডিফেন্ডার পাওলো মালদিনিকে ছাড়িয়েছিলেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রায় পুরো ম্যাচ খেলে মেসির মোট মিনিট এখন ২,৪৮৯।
এই রেকর্ড মেসির দীর্ঘ সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে টিকে থাকার আরেকটি দিক দেখায়। ৩৯-এর কাছাকাছি বয়সেও তিনি শুধু নামমাত্র মাঠে থাকছেন না; গোল করছেন, ম্যাচের ভাগ্য বদলাচ্ছেন, চাপ প্রয়োগে অংশ নিচ্ছেন, নিচে নেমে বল নিচ্ছেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিসের পরও জোড়া গোল করে তিনি দেখিয়েছেন, তার প্রভাব এখনো ম্যাচ-নির্ধারক।
মেসির জন্য অস্ট্রিয়া ম্যাচটি শুরু হয়েছিল হতাশায়। নবম মিনিটে পেনাল্টি মিস করেন তিনি। কিন্তু ৩৮ মিনিটে রেকর্ডগড়া গোল, পরে যোগ করা সময়ে আরেক গোল—এই ঘুরে দাঁড়ানোই তার বিশ্বকাপ জীবনের প্রতীক। ভুল হতে পারে, কিন্তু শেষ কথা লেখার ক্ষমতা এখনো তাঁর আছে।
চলতি বিশ্বকাপে দুই ম্যাচে মেসির গোল ৫টি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল। আর্জেন্টিনার সব গোলই এসেছে তার পা থেকে। সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়েও তিনি আপাতত সামনে, যদিও এমবাপে ও আর্লিং হলান্ড খুব কাছেই আছেন।

