• পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
  • বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
  • ||
  • আর্কাইভ

জাপানের বিশাল বিনিয়োগ: বাংলাদেশের লাভ কতটা?

প্রকাশ:  ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৫৪
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট

বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে ৬৩৫ কোটি ডলারের বেশি বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে জাপান। এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। জ্বালানি, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ও শিল্প খাতে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি বাংলাদেশের সামনে তৈরি হতে পারে প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের সুযোগ। তবে বড় অঙ্কের এই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিতে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগ বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুতি নিতে পারছে, তার ওপর।
২৭ অক্টোবর টোকিওতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা গুরুত্ব পায়। জাপানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি ইয়েন বা ৬.৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিনিয়োগ থেকে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে এটি ইতিমধ্যে বাংলাদেশে আসা অর্থ নয়; বরং আগামী পাঁচ বছরের জন্য ঘোষিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা।
বিনিয়োগে বাংলাদেশের লাভ কোথায়?
বাংলাদেশের জন্য এই বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা শুধু নতুন অর্থ আসা নয়, বরং উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস এবং শিল্প উৎপাদনে বিনিয়োগ করলে স্থানীয় কর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শেখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে গাড়ির যন্ত্রাংশ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস ও উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যে বিনিয়োগ বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে সহায়তা করতে পারে। বর্তমানে দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাকনির্ভর। নতুন শিল্প খাত শক্তিশালী হলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এখানে মাতারবাড়ী ও মহেশখালীর গুরুত্বও রয়েছে। বন্দর, জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আমদানি-রপ্তানির সক্ষমতা বাড়তে পারে এবং নতুন শিল্প স্থাপনের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
জাপান কেন বাংলাদেশে আগ্রহী?
বাংলাদেশের বড় বাজার, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরও বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ খুঁজছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ থাকলেও এই বিনিয়োগ আকর্ষণে অন্য এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে।
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কও ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৩২ কোটি ডলার। জাপানে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, নিট পোশাক ও চামড়াজাত পণ্য। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাপান থেকে যন্ত্রপাতি, লোহা-ইস্পাত, যানবাহন ও বিভিন্ন শিল্পপণ্য আমদানি করে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই হয়েছে। এই চুক্তি কার্যকর হলে বিভিন্ন পণ্যের শুল্ক সুবিধা এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সুফল পেতে বাংলাদেশের উৎপাদকদের মান, উৎপাদন সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের শর্ত পূরণ করতে হবে।
বিনিয়োগের পথে বাধা কী?
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু দীর্ঘদিনের সমস্যা রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময়, কর ও শুল্কসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাব বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
জাপানের বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থা জেট্রোর প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনার পাশাপাশি এসব প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেছেন। তাদের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের পরিমাণ ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশের তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ, সম্ভাবনা থাকা আর বিনিয়োগ বাস্তবে আকর্ষণ করা এক বিষয় নয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পর্যবেক্ষণেও ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমানোর প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
দুই লাখ কর্মসংস্থান, কতটা মানসম্মত?
প্রত্যাশিত দুই লাখ কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে চাকরির সংখ্যা ছাড়াও দেখতে হবে, সেগুলো কী ধরনের কাজ, বেতন ও সুযোগ-সুবিধা কেমন এবং স্থানীয় কর্মীরা কতটা দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন।
জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়, বাংলাদেশের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করে এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময় করে, তাহলে বিনিয়োগের সুফল দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। বিপরীতে, স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে সংযোগ দুর্বল থাকলে বিনিয়োগের সুফল সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
এ কারণে সরকারকে বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ এবং রপ্তানি বৃদ্ধির মতো বিষয়েও নজর দিতে হবে।