• পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
  • শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২ আশ্বিন ১৪২৮
  • ||
  • আর্কাইভ

আহলে হাদিস নামে জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ!

এএইচএম আহসান উল্লাহ

প্রকাশ:  ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১১:৪৫
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিন্ট

কালেমায় বিশ^াসী মুসলমানরা যে বহুভাগে বিভক্ত হবে তা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণীই রয়েছে। সিহাহ্ সিত্তাহর অন্যতম তিরমিজি শরীফের একখানা হাদিসের  অংশে মুসলমানদের দ্বিধাবিভক্তির বিষয়টি এভাবে এসেছে,  প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, বনী ইসরাঈল সম্প্রদায় বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিলো। আর আমার উম্মত হবে ৭৩ দলে বিভক্ত। এর মধ্যে ৭২ দলই হবে জাহান্নামী তথা গোমরাহী, একটিমাত্র দল হবে জান্নাতী অর্থাৎ নাজাতপ্রাপ্ত দল। সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম জিজ্ঞেস করলেন (ক্বালু মান হিয়া ইয়া রাসুলাল্লাহ) ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাজাতপ্রাপ্ত দল কোন্টি বা তাঁদের পরিচয় কী? উত্তরে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি বা যারা আমি এবং আমার সাহাবীগণের অনুসরণ ও অনুকরণ করবে।’ নবীজীর হাদিসের এই অংশ ‘মা আনা আলাইহি ওয়া আসহাবিহী’ অর্থাৎ ‘যে বা যারা আমি এবং আমার সাহাবীগণের অনুসরণ ও অনুকরণ করবে’ এর ব্যাখায় বিশ^ বিখ্যাত হাদিস ব্যাখ্যাকার মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘শরহে মিরকাতে’ মোল্লা আলী কারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি উল্লেখ করেন-৭৩ ফের্কার মধ্য থেকে একটি যে নাজাতপ্রাপ্ত দল, সেটি হচ্ছে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত।’ সিরাতুল মোস্তাকিমই হচ্ছে আহ্লে সুন্নাত ওয়াল জামাআত, সংক্ষেপে সুন্নী দর্শন। যাঁর অনুসারীদের সুন্নী মুসলমান বলা হয়ে থাকে। এ সুন্নী মতাদর্শের অনুসারী যারা তারাই প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈনগণের অনুসারী ও অনুকরণকারী।  
সম্মানীয় পাঠক, আমার এ নিবন্ধের মূল প্রতিপাদ্যে যাওয়ার পূর্বে ভূমিকা স্বরূপ উপরোক্ত কথাগুলো আনার উদ্দেশ্য হচ্ছে-মুসলমানদের মধ্যে যে দ্বিধা-বিভক্তি থাকবে, বিভিন্ন দল-উপদল থাকবে, ভ্রান্ত গোমরাহী দল থাকবে, তা যে অস্বাভাবিক কিছু নয়, সে বিষয়টি জানান দেয়া। এখন আসি আমার আজকের বিষয়ের মূল প্রতিপাদ্য ‘আহলে হাদিস নামে জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ’ বিষয়ের দিকে। খুব বেশি নাতিদীর্ঘ আলোচনা বা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দিকে না গিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে মৌলিক কথার মধ্যে থাকতেই চেষ্টা করবো।
‘আহলে হাদিস’ নামে নব্য একটি ফিতনাবাজ সম্প্রদায় যে আমাদের এতদ্বঞ্চলে আমরা গত ক’বছর যাবৎ দেখছি, এটি আমাদের মাঝে সংক্রমিত হয়েছে ডাঃ জাকির নায়েকের পিচ টিভির মাধ্যমে। এই জাকির নায়েক নিজে এবং পিচ টিভিতে যারা ধর্মীয় আলোচনা নিয়ে আসতো তাদের সবাই ‘আহলে হাদিস’ সম্প্রদায়। যে পিচ টিভিকে বাংলাদেশে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনার নেপথ্যে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করা এবং ভূমিকা রাখার অভিযোগে নিষিদ্ধ করা হয়। বাংলাদেশে গত দশ বছরে আলোচিত এবং দেশ কাঁপানো যে সব জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে যেমন ঢাকার হলি আর্টিজান হোটেলে, শোলাকিয়া ঈদগাহে জঙ্গি হামলা, আল্লামা নূরুল ইসলাম ফারুকীর (রঃ) মতো এশিয়াখ্যাত ইসলামী দার্শনিককে জবাই করে হত্যা করা ইত্যাদি আরো নিরস্ত্র মানুষকে নৃশংসভাবে খুন করার পেছনে মূল অভিযুক্ত যারা তারা আহলে হাদিস সম্প্রদায়। যাদের ব্যাপারে সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও তথ্য রয়েছে। এই আহলে হাদিস সম্প্রদায় এখন সুকৌশলে আমাদের সমাজে ঢুকছে, বিভিন্ন মসজিদকে তারা তাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টায় রয়েছে। যেমনটি তারা টার্গেট করেছে চাঁদপুর শহরের পূর্ব নাজির পাড়াস্থ এলাহী মসজিদকে। যার সূচনাতেই গত ১৯ এপ্রিল শুক্রবার জুমার নামাজের সময় মসজিদে নিয়মিত মুসল্লিদের সাথে ভাড়াটে কিছু যুবকদের (মুসল্লি বেশে মসজিদে আসা) মারামারির মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে গেলো। দেশের তথাকথিত ১৫ জন আলেমকে যে সরকার নিষিদ্ধ এবং কালো তালিকাভুক্ত করেছে তাদেরই একজন ড. মুজাফফর বিন মুহসিনকে কারা কোন্ সাহসে শহরের জনবহুল একটি মসজিদে সেদিন এনে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে তা গোয়েন্দা সংস্থার খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাদের এ অপচেষ্টা প্রশাসনিকভাবে যদি রুখে দেয়া না হয় তাহলে হয়ত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এমনকি খুনাখুনির মতো ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। কারণ, এই আহলে হাদিস সম্প্রদায়ের লোকদের চরিত্র হচ্ছে-তাদের মতবাদ প্রতিষ্ঠায় যেখানে তারা বাধার সম্মুখীন হবে, সেখানেই তারা খুনাখুনির পথ বেছে নেবে। যেমনটি তারা বিগতদিনে ঘটিয়েছে।
এই আহলে হাদিস সম্প্রদায় কখনো লা-মাজহাবী আবার কখনো সালাফী নামে পরিচিত। এই মতবাদের প্রবর্তক হচ্ছেন নাসির উদ্দিন আল বানী নামে এক ব্যক্তি। যে ব্যক্তি কথায় কথায় ‘সহীহ হাদিস সহীহ হাদিস’ ধুয়া তুলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসংখ্য সহীহ হাদিসকে জাল, মওজু, দ্বযীফ হাদিস বলে এসব হাদিসের অনুসরণ এবং আমল থেকে দূরে থাকতে সরলমনা মুসলমানদের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছেন। অথচ সে সব হাদিস রাবীর (বর্ণনাকারী) বিবেচনায় মুরসাল, হাসান সহীহ পর্যায়ের এমনকি রাবীর ধারাবাহিকতায় সে সব হাদিস হাদিসে মুতাওয়াতির পর্যায়ে পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়, যে হাদিসের ওপর আমল করা ওয়াজিব। আর এমন কিছু হাদিস যেগুলো উম্মতের জন্যে সুন্নাহ হিসেবে গণ্য নয়, অর্থাৎ হাদিসের ওপর বিশ^াস রাখতে হবে, কিন্তু আমল হিসেবে পালনযোগ্য নয়, সে সব কিছু হাদিসকে মুসলমানদের আমল করার জন্যে বাধ্যতামূলক ও বাঞ্চনীয় বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় এই নাসির উদ্দিন আল বানী। আর এ সব করতে গিয়ে তিনি উসুলে হাদিসকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করে নিজের মনগড়াভাবে হাদিসের অপব্যাখ্যা করেছেন।
প্রিয় পাঠক, দেখুন তাদের নামের মাঝেই কেমন প্রতারণা এবং বাতুলতা। ‘আহলে হাদিস’ মানে হাদিসের অনুসারী। এখন অপর কোনো মুসলমান যদি নিজেকে ‘আহলে কোরআন’ দাবি করে এ নামে আরেকটি সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটায় তখন নামের বিবেচনায় কীভাবে আপনি তাকে বাধা দিবেন বা মন্দ বলবেন? তারা আহলে হাদিস নাম দিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ পরিপন্থী সবকিছু করছে। তাদের মতবাদের সাথে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর মতবাদের মৌলিক একটি যোগসূত্র আছে। যেমন মওদুদীর নানা ভ্রান্ত মতবাদের একটি হচ্ছে মাজহাব মানা শিরক। আহলে হাদিসদের মতবাদও হচ্ছে মাজহাব মানা বিদ্আত, শিরক ইত্যাদি। অর্থাৎ তারা মাজহাব বিরোধী। এ জন্যে তাদেরকে লা-আজহাবী বলা হয়ে থাকে। অথচ আজহাব মানা আমাদের জন্যে ওয়াজিব। মাজহাবকে অস্বীকার করলে ইজমা ও কিয়াসকে এমনকি কোরআন-সুন্নাহকেও অস্বীকার করা হয়। আর এ কথা সর্বজন বিধিত যে, ইসলামী আইনের মূলভিত্তি হচ্ছে চারটি, যাকে উসুলে আরবা’ বলা হয়। এ চারটি হচ্ছে কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস। এখন এই নব্য ফিতনা আহলে হাদিস তথা লা-মাজহাবীরা মাজহাবের বিরোধীতা করতে গিয়ে শুধু ইজমা ও কিয়ামেরই বিরোধিতা করছেন না, তারা কোরআন ও হাদিসের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন।
আমাদের সমাজে তথা চাঁদপুরের আলোকেই যদি আমরা দেখি যে, আহলে হাদিস কারা? এর জবাব খুঁজতে গেলে দেখবো যে, যারা জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত, যারা মাদ্রাসা তথা দ্বীনি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন নি, তারাই এখন আহলে হাদিস নাম দিয়ে নিজেই যেনো একমাত্র ইসলামের ধারক বাহক হয়ে গেছেন এমনটা দেখাচ্ছেন। তারাই এখন কথা কথায় সহীহ হাদিস, সহীহ বুখারীর দোহাই দেন। অথচ বুখারী শরীফের মুসান্নেফের (রচয়িতা) নামও ঠিকমতো (বংশ পরম্পরাসহ) বলতে পারবেন না। অত্যন্ত দুঃখের এবং পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত ওইসব যুবকরা বাংলা অনুবাদ বুখারী শরীফ পড়ে নিত্য নতুন ফতোয়া দেয় এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে আসছে। অথচ মহাবিজ্ঞানময়গ্রন্থ আল-কোরআন এবং হাদিসে নববী বুঝার জন্যে আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সে সব প্রতিষ্ঠানে পড়া তো দূরে থাক বারান্দা দিয়েও যারা কখনো হাঁটেনি তারা যদি কোরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে ফতোয়া দেয় তাহলে তো অবস্থা এমন দাঁড়াবে যে, পবিত্র কোরআনের আয়াতের একটি অংশ ‘সকল মুসলমান ভাই ভাই’ এতটুকু অর্থের অনুসরণ করেই বলবে, আল্লাহ বলেছেন সকল মুসলমান ভাই। তাই বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী, ছেলে, চাচা, জেঠা, নানা, ফুফা, খালু, শ^শুর ইত্যাদি সবাই ভাই। কারণ আমি মুসলমান বাবাও মুসলমান, শ^শুর, চাচা এমনকি প্রিয় নবীজীও মুসলমান। তাই বাবা, শ^শুর, চাচা নবীজীও ভাই (নাউজুবিল্লাহ্)। বিষয়টি যদি আরো পরিষ্কার করে বলি, ধরুন আমি মেডিকেল কলেজে পড়লাম না, মেডিকেল সায়েন্স নিয়ে একাডেমিক কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করলাম না, মেডিকেল সায়েন্সের ওপর একাডেমিক সনদ নিলাম না, সার্জারী বিভাগে পড়াশোনা করলাম না, এমনকি পাস করার পর ইন্টার্নি করলাম না, শুধু তাই নয়, এসব কিছু করার পরও যদি আমি বিএমডিসির সনদ না নেই তাহলে আমার কি চিকিৎসক হিসেবে মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেয়ার অনুমতি মিলবে? এখন আমি যদি এসবের কোনো ক্ষেত্রেই বিচরণ না করে নানা ভাষার জ্ঞান থাকার সুবাদে আমি যদি লাইব্রেরী থেকে এক গাঁদা মেডিকেল সায়েন্সের বই কিনে এনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একেবারে মুখস্ত করে ফেলি, আর এই মুখস্ত বিদ্যা দিয়েই যদি আমি ডাক্তারি করতে যাই তাহলে তো আমার হাতে রোগীর মৃত্যু অনিবার্য। দুনিয়ার এই বিদ্যা অর্জন এবং কর্মে প্রয়োগেই যদি এতোসব নিয়মরক্ষার বাধ্যবাধকতার প্রয়োজন থাকে, তাহলে মহাবিজ্ঞানময়গ্রন্থ আল কোরআন এবং হাদীসে নববী বুঝার জন্যে সেই ধরনের প্রতিষ্ঠানে পড়তে হবে না, উসুল জানতে হবে না, বালাগাত জানতে হবে না, নাসেখ-মানসুখ বুঝতে হবে না, আয়াতে মোহকামাত, আয়াতে মোতাশাবেহাত সম্পর্কে জানতে হবে না, কোরআনের আয়াত এবং হাদিসের মধ্যে বাহ্যিক বিপরীত্যের সমাধানের জ্ঞান অর্জন করতে হবে না, তা কি হয়? আর এসব জ্ঞানের সাগরে নিজের শরীরটা একটু না ভিজিয়েই এমনকি সাগরের পাড় দিয়ে না হেঁটেই যদি কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা করে সে অনুযায়ী ফতোয়া দেয়া হয়, তাহলে এর চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে? আর এই জালিমদের নিত্যনতুন ফতোয়া অনুসরণ করে আমরা যদি দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে যাই তাহলে আমরা কতই না বোকার রাজ্যে বাস করছি। সমাজে এখন সেটাই হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে যে, কম্পিউটার ব্যবসায়ী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী ইত্যাদি নানা পেশার লোক কোরআন-হাদীসের গভীর জ্ঞান না থাকা ব্যক্তিরা এসে ধর্মীয় নানা বিষয়ে বিশৃঙ্খলা করছে। তাই এদের থেকে দূরে থাকুন। নিজের আমল, ঈমান ও সমাজকে রক্ষা করুন। আহলে হাদিস নামে নব্য ফিতনাবাজ জঙ্গি গোষ্ঠীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সবাই সতর্ক ও সজাগ থাকুন। আল্লাহ আমাদের সকলকে সকল ধরনের নব্য ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমিন। বেহুরমতে রাহমাতুল্লিল আলামিন।

 

 

সর্বাধিক পঠিত